সন্তান মারা যাওয়ার পর ৪২ দিন পর কুড়িয়ে পেলেন কন্যাশিশু


আজকের চুয়াডাঙ্গা➤ ঝিনাইদহ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৭, ২০২৩, ১১:৪৯ অপরাহ্ণ
সন্তান মারা যাওয়ার পর ৪২ দিন পর কুড়িয়ে পেলেন কন্যাশিশু

জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ছেলে। সেই শোকেই দিন কাটছিল মা সোনিয়া খাতুনের। এরই মধ্যে সকালে হাঁটতে বের হয়ে রাস্তার পাশে কুঁড়িয়ে পেলেন এক নবজাতক কন্যাশিশুকে। ঘটনাটি ঘটে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার কুশনা গ্রামে। এদিকে, শিশুটিকে পেয়ে সোনিয়া খাতুনের পরিবারে এসেছে খুশির জোয়ার।

সরেজমিনে কুশনা গ্রামে দেখা যায়, সোনিয়ার চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে পরম মমতায় শিশুটিকে কোলে নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ৪৩ দিন আগে ছেলে হারানো মা সোনিয়া খাতুন। কখনও বসে আবার কখনও হেঁটে বাঁচ্চাটিকে আদর করছেন। সদ্যভূমিষ্ট ছেলে মারা যাওয়ার পর কুঁড়িয়ে পাওয়া এই মেয়েটিকে নিয়ে পূরণ করছেন ছেলে হারানোর বেদনা। বাঁচ্চাটিকে এক নজর দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে নারী-পুরষ আসছেন তাদের বাড়িতে। কারও যেন নজর না লাগে, সে কারণে বাঁচ্চাটির কপালে কালো টিপ দিচ্ছিলেন সোনিয়া। ভালোবাসার কোনো অপূর্ণতা নেই তার মধ্যে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার কুশনা ইউনিয়নের কুশনা গ্রামের বকুল মণ্ডলের তিন মেয়ের মধ্যে সোনিয়া খাতুন সবার বড়। ৭ বছর আগে একই উপজেলার বলুহার রামচন্দ্রপুর গ্রামের রানা হামিদের সাথে তার বিবাহ হয়। কর্মসূত্রে হামিদ প্রবাসে (মালায়েশিয়া) আছেন। তাদের পরিবারে আবির নামে ৬ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। এরই মধ্যে গত সেপ্টম্বরে কোটচাঁদপুর মাহাবুবা ক্লিনিকে সিজারের মাধ্যমে দ্বিতীয় ছেলে সন্তানের জন্ম দেন সোনিয়া। কিন্তু ভূমিষ্ট হওয়ায় মাত্র ৯ ঘণ্টা পর নিউমোনিয়ায় নবজাতকটির মৃত্যু হয়। সন্তান হারানোর সেই শোকে কাতর মা সোনিয়া গত বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) সকালে হাঁটতে বের হয়ে রাস্তার পাশে বস্তায় মোড়ানো অবস্থায় কুঁড়িয়ে পান এক নবজাতক কন্যাকে। মাতৃস্নেহে আশ্রয় দেন নিজের কোলে।

রাস্তার পাশে কুড়িয়ে পাওয়া কন্যাশিশু

প্রতিবেশীরা জানান, সোনিয়ার কোল শূন্য ছিল। আল্লাহ আবারও তার কোল ভরে দিয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি নির্মমভাবে এই বাঁচ্চাটি ফেলে গেছে, তিনি কঠিন অপরাধ করছে। কতটা অমানবিক হলে এমন জঘন্য কাজ কেউ করতে পারে। কত মানুষ একটা সন্তানের জন্য ডাক্তার-কবিরাজ কত কিছু করছে। আর এমন একটা ফুটফুটে বাঁচ্চা জন্ম দিয়েও তাকে ফেলে দেয়, এটা খুবই কষ্টদায়ক। এদের খুঁজে বের করে আইনের আওয়তাই আনা উচিৎ।

সোনিয়া খাতুন বলেন, ‘প্রায়ই বোনের সঙ্গে সকালে হাঁটতে বের হয়। বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) সকালেও হাঁটার জন্য কোটচাঁদপুর-তালসার সড়কে গেলে রাস্তার পাশে বস্তা ও কাপড়ে মোড়ানো কিছু পড়ে থাকতে দেখি। এসময় কাপড় খুলতেই তার মধ্যে নবজাতক শিশুটিকে দেখি। শিশুটি সেখানে কীভাবে এলো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বাঁচ্চাটি জীবিত না মৃত দেখার জন্য কোলে তুলে নিলে তার নিঃশ্বাস টের পেয়ে দ্রুত বাড়িতে এনে তাকে পরিষ্কার করে নিজের স্তন পান করায়।

এরই মধ্যে ঘটনাটি গ্রামে জানাজানি হলে পুলিশ এসে বাঁচ্চাটিকে চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলে। আমি ওকে কোটচাঁদপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। ডাক্তার বাঁচ্চাটিকে দেখেন এবং বলেন বাঁচ্চাটি সুস্থ আছে। ডাক্তার দেখানো হয়ে গেলে বাড়িতে চলে আসি। বাড়িতে আসার পর জানতে পারি ইউএনও, ওসি ও সমাজসেবা কর্মকর্তা সবাই বাঁচ্চাটিকে অন্য জায়গায় দেওয়ার জন্য বলছে। কিন্তু আমি কিছুদিন হলো ছেলে সন্তান হারিয়েছি। আমার শূন্য বুকে সৃষ্টিকর্তা এই মেয়ে সন্তানটিকে দিয়েছে। আমার জীবন চলে গেলেও ওকে আমি কাউকে দেব না। আমি ওকে কখনো অন্যের হাতে তুলে দিতে পারব না। আমি গরিব বলে আমার কাছে সে ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না? সবাই এমন কথা বলছে। গরিবের ঘরের সন্তানরাও অনেক ভালো থাকে, মানুষের মতো মানুষ হয়, অফিসার হয়। আমি ওকে কাউকে দিতে দিবো না। আমার সন্তান আমার কাছেই থাকবে।’

কুশনা ইউপি সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান বাবুল হোসেন বলেন, সোনিয়া সকালে হাঁটতে গিয়ে নবজাতক কন্যাশিশুটিকে রাস্তার পাশে পেয়েছে। বাঁচ্চাটি পাওয়ার পর জানাজানি হলে পুলিশের কর্মকর্তারা আসেন এবং বাঁচ্চাটির প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। বাঁচ্চাটির প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, বাঁচ্চাটি সুস্থ আছে। তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কোটচাঁদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ ও সমাজসেবা অফিসার সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাঁচ্চাটিকে একটি নিরাপদ ও স্বচ্ছল পরিবারের হেফাতজে দিবেন। ছোট্ট নবজাতককে কীভাবে কার কাছে দিবেন, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। তবে আমাদের দাবি, নবজাতক ছেলে সন্তান হারানো সোনিয়া যিনি বাঁচ্চাটিকে পেয়েছেন, বাঁচ্চাটি তার কাছেই দেওয়া হোক।

কোটচাঁদপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম জানান, শিশুটিকে হস্তান্তরের জন্য বৃহস্পতিবার আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সাতজন আবেদন করেছেন। আবেদন নেওয়া শেষ হলে উপজেলা শিশুকল্যাণ বোর্ডের সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে শিশুটিকে কার কাছে দিলে ভালো হবে। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক নবজাতকটিকে হস্তান্তর করা হবে।

আজকের চুয়াডাঙ্গা এর সংবাদ সবার আগে পেতে Follow Or Like করুন আজকের চুয়াডাঙ্গা এর ফেইসবুক পেজ এ , আজকের চুয়াডাঙ্গা এর টুইটার এবং সাবস্ক্রাইব করুন আজকের চুয়াডাঙ্গা ইউটিউব চ্যানেলে